rupalibangla
rupalibangla rupalibangla rupalibangla rupalibangla rupalibangla
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

শিরোনাম

ইন্টারন্যাশনাল পিস ফাউন্ডেশনের সমন্বিত মেধা তালিকায় যশোরের ৩২ শিক্ষার্থী পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বাড়ল বিদ্যুতের দাম জনগণের দেয়া রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে : মামুনুল হক প্রেসক্লাব যশোরের সদস্যপদ প্রদানসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনে সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর আবার দাম বাড়ল পেট্রোল-অকটেন ও কেরোসিনের জামায়াতের মামলা : ঝালকাঠি-১ আসনের নির্বাচনী নথি সংরক্ষণের আদেশ আড়াল হয়ে যাচ্ছে কোরবানির প্রকৃত আত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা ইরানের বন্দরগুলো থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেয়ার ঘোষণা ট্রাম্পের শুধু পশু নয়, মানুষের মনের পশুত্বকেও কুরবানি করতে হবে : গোলাম পরওয়ার মহাকাশ স্টেশনে তিনজন মহাকাশচারী পাঠিয়েছে চীন
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

শাপলা থেকে জুলাই বিপ্লব : এ ভূখণ্ডের রক্তের ঋণ

জোবায়েদ হোসেন

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৫ মে,২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম
শাপলা থেকে জুলাই বিপ্লব : এ ভূখণ্ডের রক্তের ঋণ

২০১৩ সালের ৫ মে। ঢাকার শাপলা চত্বর—দিনটা যেন শুরু হয়েছিল আর দশটা দিনের মতোই, কিন্তু শেষটা লিখে রেখেছিল এক ভারী, অস্বস্তিকর ইতিহাস। সকাল থেকেই ঢাকা অভিমুখে মানুষের ঢল নামে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ—মাদ্রাসার ছাত্র, আলেম, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ—এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। তাদের কণ্ঠে একটাই কথা, একটাই স্লোগান, একটাই দাবি—“১৩ দফা”। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর ডাকে তারা এসেছিল। কারো হাতে ব্যানার, কারো চোখে উত্তেজনা, আবার কারো ভেতরে ছিল এক ধরনের অজানা আশঙ্কা। মধ্যাহ্ন গড়ালে শাপলা চত্বর হয়ে ওঠে এক বিশাল মানবসমুদ্র। কেউ বক্তৃতা শুনছে, কেউ স্লোগান দিচ্ছে, কেউ আবার মাটিতে বসে দোয়া পড়ছে। “এইবার হয়তো কিছু একটা পরিবর্তন আসবে…” “দাবিগুলো মানা হবে…” “মহানবী (সা.) ও পবিত্র কুরআনের অবমাননাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে...” “এত মানুষ এসেছে, সরকার উপেক্ষা করতে পারবে না…”

উপস্থিত জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তৎকালীন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক তাঁর বক্তব্যে বলেন: “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো; জীবন দেবো। রক্তের বিনিময়ে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর নবীর ইজ্জতের হেফাজত করেই ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ। সংগ্রামী তৌহিদী জনতা! লাশের পর লাশ পড়বে, রক্তের গঙ্গা বইবে; জীবনের পর জীবন দেবো। তোমাদের কাছে যত বুলেট আছে—তোমাদের সমস্ত বুলেটকে মোকাবিলা করার জন্য আমাদের বুক রয়েছে। উন্মুক্ত বুকে আমরা তোমাদের বুলেটগুলো পেতে নেব।”

সূর্য ডুবে গেলে পরিবেশটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। দিনের গরম কমে আসে, কিন্তু বাতাসে চাপা উত্তেজনা বেড়ে যায়। শহরের অন্যপ্রান্তে ছোটখাটো সংঘর্ষের খবর ভেসে আসে। তবুও অনেকেই থেকে যায়—ভাবছে, রাতটা কাটিয়ে সকালেই হয়তো সমাধান আসবে।

রাত গভীর হয়। কেউ ক্লান্ত হয়ে ব্যানারের ওপর শুয়ে পড়ে, কেউ গুটিসুটি মেরে বসে থাকে। চারদিকে অল্প আলো—রাস্তার বাতি, মোবাইলের ক্ষীণ আলো। ঠিক তখনই, হঠাৎ করে পরিস্থিতি বদলে যায়। চারদিক থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ঘন হয়ে ওঠে। পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি—সবাই মিলে এক অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি করে ফেলে। কেউ তখনও বুঝে উঠতে পারেনি কী হতে যাচ্ছে। একসময় আলো নিভে যায়। এলাকা ডুবে যায় অন্ধকারে। তারপর—একটা বিকট শব্দ। আরেকটা। তারপর একসাথে অনেকগুলো। শুরু হয় ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’। লাইট বন্ধ করে এবং গণমাধ্যমকে দূরে রেখে শুরু হয় এক নৃশংস অভিযান। সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ, টিয়ারশেলের ধোঁয়া, আর গুলির শব্দ—সব মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে শাপলা চত্বর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। লাল রক্তের ভেসে যায় শাপলার প্রান্তর। এ যেন আল মাহমুদের 'আমাদের মিছিল' কবিতার বাস্তব প্রতিধ্বনি—“আমাদের দেহ ক্ষত-বিক্ষত, আমাদের রক্তে সবুজ হয়ে উঠেছিল সূতার প্রান্তর।”

মানুষ ছুটতে শুরু করে, কিন্তু কোথায় যাবে? সামনে অন্ধকার, চারপাশে আতঙ্ক। কেউ পড়ে যাচ্ছে, কেউ অন্যকে টেনে তুলছে, কেউ আবার ধোঁয়ার মধ্যে দিক হারিয়ে ফেলছে। চোখ জ্বালা করছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সেই অন্ধকারে কে আহত, কে বেঁচে আছে—কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। অনেকেই পরে বলেছিল—সেই রাতে মনে হয়েছিল, সময় থেমে গেছে। কেউ জানত না কতক্ষণ ধরে এই অভিযান চলেছিল। রাতের শেষে, ধীরে ধীরে শব্দ থেমে যায়। বিভীষিকাময় ভোর হয়। ঢাকার মানুষ যখন ঘুম থেকে ওঠে, তখন শাপলা চত্বর যেন একেবারে অন্যরকম। রাস্তা পরিষ্কার, যানবাহন চলছে স্বাভাবিকভাবে। আগের রাতের সেই লাখো মানুষের কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নেই—শুধু কিছু ছিন্ন কাগজ, ভাঙা জিনিসপত্র, আর অদৃশ্য এক ভারী নীরবতা। কিন্তু আসল গল্পটা তখনো শেষ হয়নি। নিহতের সংখ্যা নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ দাবি করে—হাজারো নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। সরকারি পক্ষ জানায়—মাত্র ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই দুই সংখ্যার মাঝখানে তৈরি হয় এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এর তদন্তে ৫৮ জনের মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়। তবুও পুরো সত্যটা যেন এখনো সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত হয়নি।

বছর কেটে যায়। রাজনীতি বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু সেই রাতের স্মৃতি থেকে যায়। অনেক পরিবার আজও জানে না তাদের প্রিয়জনের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল। অনেকের জন্য ৫ মে মানে—একটি অপূর্ণ প্রশ্ন, একটি অমীমাংসিত বিচার।

অবশেষে, দীর্ঘ সময় পর এই ঘটনার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করা হয়। তদন্তের প্রক্রিয়াও এগিয়েছে, কিন্তু এখনো এটি সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি পায়নি। আজও যখন কেউ শাপলা চত্বর দিয়ে হেঁটে যায়, হয়তো চোখে নারকীয়তার কিছুই পড়ে না। কিন্তু ইতিহাস জানে—এই জায়গার মাটিতে এক রাতের অন্ধকার এখনো নীরবে কথা বলে। এই মাটিতেই বপন হয়েছিল তাওহীদের বীজ, যে বীজ অঙ্কুরোদ্গম হয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। রক্ত—আবারও রক্ত। প্রায় এক হাজার শহিদের বিনিময়ে এক নতুন স্বাধীনতা। দ্বিতীয় স্বাধীনতা। এই ভূখণ্ডের রক্তের ঋণ কবে শোধ হবে?

লেখক : শিক্ষার্থী, ডুয়েট

সম্পর্কিত

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন