রূপালী প্রতিবেদক, যশোর
অদৃশ্য সিন্ডিকেট আর ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে ৩০ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় এবারও মারাত্মক পুঁজি সংকটে রয়েছেন যশোরের চামড়া ব্যবসায়ীরা। আর এ কারণে এবার কোরবানির ঈদে চামড়া ব্যবসা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ধস নামা যশোরের ঐতিহ্যবাহী এ চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে থাকা বকেয়া ৩০ কোটি টাকা আদায়ে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ চান ব্যবসায়ীরা।
যশোর শহর থেকে যশোর-খুলনা মহাসড়ক ধরে সাড়ে ৫ কিলোমিটারের দূরত্বে রাজারহাট বাজার দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়ার হাট। এ হাটে ছোট-বড় মিলে দুই শতাধিক চামড়ার আড়ত রয়েছে। এসব হাটকে কেন্দ্র করে ৫ সহস্রাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। যশোর এবং খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও ঢাকা, পাবনা, নাটোর, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, খুলনা, ফরিদপুরসহ অন্তত ২০ জেলার পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করতে আসেন এখানে। কিন্তু দেড় দশক আগে থেকে এখনকার ব্যবসায় নানা কারণে ভাটা চলছে।
ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী যশোর সদর উপজেলার রামনগর গ্রামের আব্দুল হামিদ বলেন, আমরা বংশ পরম্পরায় এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ঢাকার ট্যানারি মালিকরা আমার প্রায় কোটি টাকা আটকে রেখেছেন। ব্যবসা বন্ধ করে দিলে সেই টাকা উদ্ধারের পথ একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। তাই প্রতিবছর কোরবানির সময় ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে আবার ধরা খাই। এভাবে চলতে
চলতে পৈতৃক জমাজমি এবং সঞ্চয় যা ছিল সবই হারিয়েছি। কিন্তু সেই টাকা তো উদ্ধার হয়ইনি, উল্টো দেনা আরও বেড়েছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে দিন দিন পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে।
রাজারহাটের ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমেদ পাপ্পু বলেন, বর্তমানে বাজারের প্রতি ফুট চামড়া প্রকার ও মানভেদে ১৫ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছেÑ যা মাস খানেক আগের চেয়ে গড়ে ১৫ টাকা কম। বিগত বছরগুলোর রেকর্ড থেকে বলা যায়, কোরবানি পরপরই তা আরও অনেক কমে যাবে। তার অভিযোগ, ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণেই প্রতিবছর কোরবানি এলে চামড়ার দাম রহস্যজনকভাবে কমে যায়। আবার চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ লবণের দাম বস্তাপ্রতি ৮৫০ থেকে বেড়ে ৯০০-৯৫০ টাকায় ওঠে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পরিবহন খরচও। এভাবে আমিসহ অনেক ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
আবদুল মালেক নামে রাজারহাট চামড়া হাটের এক আড়তদার বলেন, সরকার ট্যানারি মালিকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়। কিন্তু যশোরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের তা দেওয়া হয় না। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে ৩০ কোটি টাকা পড়ে থাকা এবং ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে লোন না পাওয়ায় যশোরের ব্যবসায়ীরা মারাত্মক পুঁজি সংকটে আছেন।
রাজারহাট চামড়ার হাটের নতুন ইজারাদার রাজু আহমেদ বলেন, চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রধান দুই সমস্যাÑ সিন্ডিকেট ও ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে যশোরের ব্যবসায়ীদের টাকা আটকে থাকা। তিনি আরও বলেন, বিগত ১৭ বছরের সরকার পরিকল্পিতভাবে এ শিল্পকে ধ্বংস করেছে। এক সময়ের কোটি কোটি টাকার এই হাটের বড় বড় ব্যবসায়ীরা আজ নিঃস্ব। তাদের কেউ রাস্তায় চা বিক্রি করছেন, কেউ চালাচ্ছেন ইজিবাইক।
যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি গিয়াসউদ্দিন বলেন, কোরবানির সময় চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে অদৃশ্য সিন্ডিকেট কাজ করে। রাজারহাটের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে থাকা বকেয়া টাকা আদায়ে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আশেক হাসান বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে চামড়া বাজার মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।