রফিকুল ইসলাম, যশোর/এম.এ জলিল, অভয়নগর (যশোর) :
যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি অর্থনৈতিক জোনের দুয়ার খুলেছে যশোরে। যশোরাঞ্চলসহ জাতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাকা সচল করতে যশোরে নির্মিত হচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম ইপিজেড (এক্সপোর্ট প্রোসেসিং জোন, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা)। কিন্তু এই মেগা প্রকল্প ঘিরে এ অঞ্চলে শিল্পায়নের স্বপ্ন যেমন ডানা মেলছে, তেমনি বসতভিটা ও ফসলি জমি হারানো মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ অধিগ্রহণকৃত জমির ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। অধিগ্রহণকৃত জমির সরকারি মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
ইপিজেড কী :
এটি দেশের ভেতরে অবস্থিত একটি বিশেষ শিল্প এলাকা, যা মূলত রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানার জন্য তৈরি করা হয়। এখানে বিদেশ থেকে শুল্ক ছাড়াই কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি এবং তা আবার বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের রপ্তানি আয় বাড়ানোই এর মূল কাজ।
একনেক সভায় যশোর ইপিজেড অনুমোদন :
দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার যশোরের অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের ৮টি মৌজার ৫০৩ একর জমিতে ইপিজেড গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রোসেসিং জোন অথরিটি-বেপজা) এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
বর্তমান অবস্থা :
সরকারি তথ্যমতে, ইতোমধ্যে জমির দখল নিয়ে উন্নয়ন কাজ শুরু করেছে বেপজা। জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৬৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত ১ হাজার ৬০০ জমির মালিকদের জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এখন পর্যন্ত সামগ্রিক প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ১৫-২০ শতাংশ। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার সরকারি সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। তবে কাজের সার্বিক অগ্রগতি ও বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে এটি পুরোপুরি সচল হতে এবং বিনিয়োগকারীদের প্লট বরাদ্দ দিয়ে উৎপাদন শুরু করতে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সময় লেগে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রসমূহের অনুমান।
শিল্প প্লট সংখ্যা ও ধরন :
এই ইপিজেডে মোট ৪৩৮টি শিল্প প্লট তৈরি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে প্রায় ২০০টি প্লট। এখানে মূলত দেশি-বিদেশি যৌথ ও শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, ইলেকট্রনিক্স এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে।
কর্মসংস্থান হবে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের :
ইপিজেডের মূল কারখানাগুলোতে সরাসরি প্রায় দেড় লাখ দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া পরিবহন, লজিস্টিকস, আবাসন ও অন্যান্য সেবামূলক খাতে আরও প্রায় ৩ লাখ মানুষের আয়ের উৎস তৈরি হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র পুরোপুরি বদলে দেবে বলে সরকারি, বেসরকারিসহ সব মহলের আশা।
ত্রিমুখি চমৎকার ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ :
ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে যশোর ইপিজেড পদ্মা সেতু এবং মোংলা বন্দর উভয়ের সাথেই অত্যন্ত চমৎকার ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত। এই সংযোগটি মূলত সড়ক ও রেল—উভয় পথেই তৈরি হয়েছে, যা এই ইপিজেডের তৈরি পণ্য দ্রুত দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
যশোর ইপিজেড থেকে মোংলা বন্দর (দূরত্ব মাত্র ৬০-৬৫ কিমি) সবচেয়ে কাছের সমুদ্রবন্দর, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য প্রধান রুট হিসেবে কাজ করবে। ইপিজেডটি খুলনা-যশোর মহাসড়কের একেবারে কোল ঘেঁষে স্থাপিত হচ্ছে। এই মহাসড়ক ধরে রূপসা সেতু (খান জাহান আলী সেতু) হয়ে সরাসরি মোংলা বন্দরে পৌঁছানো যায়।
আবার খুলনা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত নতুন রেলপথ ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। যশোর ইপিজেডের ঠিক পাশেই রয়েছে চেঙ্গুটিয়া ও নওয়াপাড়া রেলস্টেশন। ফলে ভবিষ্যতে ট্রেনলাইনের মাধ্যমে কন্টেইনার সরাসরি মোংলা বন্দরে আনা-নেওয়া করা যাবে, যা পণ্য পরিবহনের খরচ কমিয়ে দেবে।
এদিকে পদ্মা সেতু চালুর ফলে রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে যশোর ইপিজেডের দূরত্ব ও সময় অভূতপূর্বভাবে কমে গেছে। সড়কপথে যশোর ইপিজেড থেকে নড়াইল হয়ে ভাঙ্গা জংশন এবং এরপর পদ্মা সেতু পার হয়ে সরাসরি ঢাকা পৌঁছানো যায়। এর আগে যেখানে ঢাকা পৌঁছাতে ১০-১২ ঘণ্টা লাগত, এখন পদ্মা সেতুর কল্যাণে মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার মধ্যে ইপিজেড থেকে পণ্যবাহী যানবাহন ঢাকায় পৌঁছাতে পারে।
ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা ও নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত নতুন ব্রডগেজ রেলপথের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই রেল রুটটি অভয়নগরের পাশ দিয়েই গেছে। এর ফলে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগের মাধ্যমে পণ্য আনা-নেওয়া করা খুবই সহজ হবে।
যোগাযোগের এই ত্রিমুখি সুবিধার জন্য এই ইপিজেডের কাঁচামাল মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করে কারখানায় আনা এবং উৎপাদিত তৈরি পণ্য পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা বা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা যাবে খুব সহজে, অত্যন্ত কম সময়ে এবং কম খরচে। এই ভৌগোলিক সুবিধার কারণেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যশোর ইপিজেডে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।
ন্যায্য দাম না পেয়ে অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত :
এতো বিপুল সম্ভাবনার মাঝেও রয়েছে নিরাশার কালো ছায়া। অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জমির ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। তাছাড়া ক্ষতিপূরণের টাকা যা দেওয়া হচ্ছে তার গতিও অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। তিন বছরে মাত্র ৩০ শতাংশ জমির মালিককে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ৭০ শতাংশ জমির মালিকরা বছরের পর বছর সারাদিন ঘুরছেন ডিসি অফিসের এ টেবিল থেকে সে টেবিলে। দিন শেষে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে। বসতভিটা ও ফসলি জমি হারানো মানুষেরা কবে নাগাদ ক্ষতি পূরণের টাকা পাবেন তাও কেউ বলতে পারছেন না। অধিগ্রহণকৃত ৪ বিঘা জমির দামে মানুষ ১ বিঘা জমিও কিনতে পারছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় জমির মালিকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ।
জমির মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি :
স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ অনুযায়ী গ্রামীণ এলাকায় বাজার দরের ওপর ৩ গুণ (২০০ শতাংশ অতিরিক্ত) এবং শহর এলাকায় জমির মালিকদের ২ গুণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে ধীরগতি :
অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ শতাংশ জমির মালিক ক্ষতিপূরণের চেক হাতে পেয়েছেন। অবশিষ্ট মালিকরা ডিসি অফিসে বছরের পর বছর ঘুরছেন প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও আইনি জটিলতা নিরসনে। ক্ষপিূরণের টাকা পরিশোধে বিলম্বের কারণ হিসেবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নথিপত্রের ত্রুটির কথা বলা হলেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালালদের দৌরাত্ম্য এবং উৎকোচ ছাড়া ফাইল নড়ছে না।
যা বলছেন জমির মালিকরা :
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সরেজমিনে কথা হয় অধিগ্রহণকৃত জমির মালিক বনগ্রাম গ্রামের মহাসীন আলী, আনোয়ার সরদার, আমিনুল ইসলাম, আজিমুল ইসলাম, কৃপা মালো, প্রেমবাগ গ্রামের বাবুল হোসেনের সাথে। তারা সবাই প্রায় একই সুরে কথা বলেন। তাদের অভিযোগ, সরকার ৪ বিঘা জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ যে টাকা দিচ্ছে তা দিয়ে আশেপাশে এক বিঘা জমিও কিনতে পারছেন না। তাছাড়া সেই টাকাও বছরের পর বছর ডিসি অফিসে ঘুরেও পাচ্ছেন না। বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপন করা হচ্ছে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিজেদের জমির ক্ষতিপূরণের টাকা নিতে তাদেরকে ডিসি অফিসে ভিক্ষুকের মতো ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে, যা খুবই বেদনার। আমরা ভিটেমাটি হারিয়ে এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে।’
জমির মালিকদের প্রত্যাশা :
স্থানীয় জমির মালিকরা বলছেন, ‘যশোর ইপিজেড এই অঞ্চলে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখবে। কিন্তু জমির মালিকরা এর সুফল পাচ্ছেন না। অধিকাংশ কৃষক তাদের একমাত্র উপার্জনের উৎস ফসলি জমি হারিয়ে দিশেহারা। তারা বলছেন, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এবং জমির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করে এই উন্নয়ন জমির মালিকদের জন্য ‘মরণ ফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যশোর ইপিজেড এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। কিন্তু উন্নয়নের সুফল যেন সাধারণ মানুষের কান্নার কারণ না হয়, সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। জমির বাজার মূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে মূল্য পুননির্ধারণ এবং হয়রানি মুক্তভাবে দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদানই এখন সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি।
যা বলছেন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা :
অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের অভিযোগের বিষয়ে এ প্রতিবেদকের টেলিফোনে কথা হয় যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, অর্পিত সম্পত্তি সেল) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বাসুদেব কুমার মালোর সাথে। তিনি জানান, ‘ইতোমধ্যে ৩০-৪০ শতাংশ জমির মালিক ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়ে গেছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাকি জমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, ‘যে মৌজায় জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, সেই মৌজায় গত ১২ মাসে সম্পাদিত জমির সাব-রেজিস্ট্রি দলিলের গড় মূল্যের ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে সমস্যাটা অন্য জায়গায়। জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় সরকারি কর বাঁচাতে অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত বাজার দরের চেয়ে দলিলে অনেক কম দাম দেখান। সরকার যখন সেই দলিলের গড় হিসাব করে, তখন তা বর্তমান বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যায়। ফলে ৩ গুণ ক্ষতিপূরণ দিলেও তা বর্তমান বাজার দরের চেয়ে চার ভাগের এক ভাগ হয়ে দাঁড়ায়।’