তরিকুল ইসলাম তারেক, যশোর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সরকার সংবিধান সংস্কারে গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে জনগণের বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। ৭০ শতাংশ জনগণের দাবি আদায়ে বিরোধীদলের আন্দোলনকে পতিত সরকার ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে বিএনপি সরকার এমন ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তিনি বলেন, এই জুজুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। ভয় দেখিয়ে জনগণের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করার বাহানা করা হচ্ছে। শনিবার দুপুরে প্রেস ক্লাব যশোরে শহীদ সাংবাদিক গোলাম মাজেদ অডিটোরিয়ামে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
আগামী ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা-খুলনা-যশোর-ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া লংমার্চ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
১১ দলীয় ঐক্যের আহবান ইতিমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-রংপুর অভিমুখে দুটি লংমার্চ শান্তিপূর্ণ ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ৩১ অক্টোবরের লংমার্চ শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃংঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার জন্য সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা চান তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণপ্লাজায় আমরা ৩৩টি রাজনৈতিক দল ৭২টি বৈঠক করে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম। আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, গণভোটের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কারে যে আইনী কাঠামো উন্মোচিত হয়েছে সেটা সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে একটি কনস্টিটেড ফোরাম বা কাউন্সিল হবে। এটা ১৩ নভেম্বর ২০২৫ এর রাষ্ট্রপতির অর্ডার। ৭০ ভাগ জনগণ হ্যা তে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত সংস্কারের আইনী পদ্ধতি উপেক্ষা করে সমস্ত দলকে বাদ দিয়ে একদলীয় কায়দায় বিরোধীদল উপেক্ষা করে সংবিধান সংস্কার না করে সংবিধান সংশোধনে নিজেদের মত করে পছন্দের লোক দিয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।
আমাদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারের এই উদ্যোগকে প্রত্যাখান করেছেন। কারণ এই পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের কথা গণভোটে হয়নি। নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে। তারা শপথ নেবেন। তাদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য বিএনপি ঐক্যমত কমিশনের প্রস্তাবকে বাদ দিয়ে ১০-১২টি মৌলিক কাঠামোতে দেয়া নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে তাদের মত করে সংবিধান সংশোধন করতে চায়।
বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ৩১ দফার প্রথম কর্মসূচি ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন। এখন তারা আর সংস্কার বলে না। বলছে সংশোধন। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে সংসদে পাশ হওয়া সংবিধান সংশোধনী আদালতে বাতিল হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের সাত দফার দাবির প্রথম দফা হলো যে, কোনো সংশোধন নয়, গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত আইনী পদ্ধতিতেই সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এটাই মূলত আইন। এটা না মানার অর্থই হলো জনগণের আস্থার প্রতি গাদ্দারী করা বিশ্বাস ঘাতকরা করা। দ্বিচারিতা করা। বিশ্বাসভঙ্গ করা। সরকারকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, আপনারা গণভোটের পক্ষে হ্যা ভোট চেয়েছেন।
জনগণ হ্যা বলেছে চারটি পয়েন্টে। এই চারটি পয়েন্টই আপনাদেরকে মানতে হবে। মাত্র কয়েক মাসের জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তের স্মৃতি ভুলে গেছে? শত শত জুলাই যোদ্ধারা এখনো শরীরে বুলেটের স্প্রিন্টার নিয়ে দিনাতিপাত করছে। প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণ দিয়েছে। চোখ হারিয়েছে। পঙ্গু হয়েছে। আহত হয়েছে। এই দেশটাকে বদলে দেবার জন্য। এই জন্য আমরা লংমার্চের আয়োজন করেছি।
এতবড় রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর, গণভোটের রায়কে আপনি উপেক্ষা করবেন? অধিবেশনের প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক ডাকার কথা ছিল, আপনি ডাকেননি। ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার শেষ করতে হবে। এই অক্টোবরে সেই সময় শেষ হয়ে যাবে। সব শেষ হয়ে যাবে অথচ ৭০ শতাংশ জনগণের রায়ের ব্যাপারে বিরোধীদল কথা বলবে না? লংমার্চ হচ্ছে নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। এটার মাধ্যমে আমরা জনমতকে জুলাই অভ্যূত্থানের পক্ষে সংগঠিত করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, সরকার যে জনগণের বিশ্বাসভঙ্গ করেছে জনগণের কাছে তা আমরা জানাতে চাই। দ্বিতীয় দফা হচ্ছে আইনশৃংঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি। খুলনার একটি সংবাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, পুলিশকে একা চলতে নিষেধ করেছে চিঠি ইস্যু করেছেন পুলিশ সুপার। তৃতীয় দফা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে করা। তিনি বলেন, সব জায়গায় কর্তৃত্ববাদী শাসনের সুর দেখতে পাচ্ছি।
চতুর্থ দফা, বিদ্যুৎ জ্বালানী গ্যাস সার সংকট দুর করতে হবে। বিএনপির কর্মীরাই সারের ডিলার পাবে বলে একজন মন্ত্রীর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন। তিনি বলেন, বিএনপির স্লোগান সবার আগে বাংলাদেশ। এখন দেখছি সবার আগে বিএনপি। পঞ্চম দফা: সরকারের সংকীর্ণ দলীয়করণ পরিহার করতে হবে। চাকরির নিয়োগে ছাত্রদলকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। মেধার মূল্য নেই। হাট কমিটি, স্কুল কমিটি, বাজার কমিটি থেকে শুরু করে ইমাম মোয়াজ্জিনের বেতনের ক্ষেত্রেও দলীয়করণ করা হচ্ছে। সব কমিটিতে দলীয় লোক বসানো হচ্ছে। কৃষক কার্ড ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা করা তার সুপারভাইজারি করা সব জায়গায় দলীয় লোক বসানো হচ্ছে। দলীয়করণে গোটা দেশ এখন জিম্মি।
ষষ্ঠ দফা: দুর্নীতি, চাঁদাবাজী ও দখলদারী বন্ধ করতে হবে। এসব দেদারছে চলছে। আগের সরকারের শুধু নামটা পাল্টে গেছে, চরিত্র আচরণ সব একই। ট্রাক স্ট্যান্ড, বেবি স্ট্যান্ড, বালুর ঘাট, নদীর ঘাটে সমানতালে চাঁদাবাজি চলমান।
সপ্তম হচ্ছে জুলাইয়ের গণহত্যাকারীদের বিচার। জুলাই গণত্যার সাথে জড়িত কিছুলোকের বিচার হয়েছে। তা এখনো কার্যকর হয়নি। কিছুলোক পালিয়ে গেছে। তাদের গ্রেফতার ও বিচার করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি ফ্যাসিস্টদের অনেকেই জেল থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। তারা ধীরে ধীরে কিন্তু রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন আবির্ভুত হচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দল মিছিল করছে আর সরকারের গোয়েন্দারা জানে না তা হতে পারে না।
তিনি বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কর্মসূচি দিচ্ছি। লংমার্চের মাধ্যমে সরকারের বোধদয় হবে বলে আশা করি। সরকার সঠিক পথে ফিরে আসুক। গণবিরোধী ভূমিকার অপরিনামদর্শী চিন্তা থেকে তারা ফিরে আসবে বলে আশা করেন জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিগত দিনে ১১ দলীয় জোটের অধীনে দুটি লং মার্চ সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এবারের লং মার্চও একইভাবে শান্তিপূর্ণ থাকবে। লং মার্চের কারণে সাময়িক যাতায়াত ও চলাচলে যে ভোগান্তি হতে পারে, সে জন্য ওই অঞ্চলের ব্যবসায়ী, পথচারীসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে অগ্রিম দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
লং মার্চের কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে তিনি বলেন, নির্ধারিত দিনে সকাল ৭টায় ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে এক সংক্ষিপ্ত জনসভার মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর পদ্মা সেতু হয়ে প্রায় ১ হাজার গাড়ির এক বিশাল বহর নিয়ে লং মার্চটি কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হবে। যশোরের মুড়লী মোড়ে, ঝিনাইদহে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করবেন। প্রায় ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ এই পথযাত্রায় মিডিয়াকর্মী, চিকিৎসক, শিল্পী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেবেন।
প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক মো: মোবারক হোসেন, কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ, যশোর জেলা জামায়াতের আমীর গোলাম রসূল, সংসদ সদস্য মোক্তার আলী এবং ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর জামায়াতের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রেস ক্লাব শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান অডিটোরিয়ামে খুলনা বিভাগের সকল এমপি এবং জেলা নেতৃবৃন্দদের নিয়ে লংমার্চের প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়।